প্রত্যেকের জীবন এক একটি উপন্যাস, প্রথম পাতায় জন্মের শেষ পাতায় মৃত্যু!

আমার আর বড়োলোক হওয়া হল না!

Share:

হঠাৎ করে আজ একটা পুরনো কথা মনে পড়ে গেলো, সময়টা ২০১০-১১ সাল, সবে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সম্মানের সাথে B.Tech পাশ করেছি। চোখে এক অদ্ভুত স্বপ্ন, নামী কোম্পানিতে মোটা টাকার চাকুরী বা বিদেশের ডাক। আমি তখন টকবগে ঘোড়া, চিহি চিহি ডাক দিয়ে দিয়ে বারাসাত দাপিয়ে বেড়াই সাইকেলে। ট্যাঁকের জোর নেই, তাই আর মোটর সাইকেল জোটেনি কপালে। বাবার ট্যাঁক খালি করে পড়াশুনা করেছি, তাই আর মুখ ফুটে আধুনিক বাহন চাইনি।

যাই হোক আসল কথায় আসি, আমার বাল্যবন্ধু শ্রীমান Babu Stiff Roy তখনও নামের অলংকার কেটে ফেলেনি, তখনোও উনি বাবু। নামের অলংকার কেটে ফেলার জোর কদমে তোড়জোড় চলছে, “বাবু” টা অপারেশন করে কাটা পড়বে এবং ও Stiff Roy নামে পরিচিতি লাভ করবে। ওর বাড়িতেই ওর এক দূর সম্পর্কের দাদা, যিনি জ্যোতিষ চর্চা করেন, একবার এসেছিলেন। খবরটা ওই আমাকে দিয়েছিল, এবং কবে আসবে আমাকে বলেও দিয়েছিল। নির্দিষ্ট দিনে সাবান দিয়ে ডান ও বাম হাত ভালো করে ধুয়ে হাত দেখাতে গিয়েছিলাম।

তিনি stiff এর হাত দেখে বলেছিলেন, যে ওর বিদেশ যাওয়ার যোগ আছে এবং উন্নতির গ্রাফ চড়চড় করে উঠবে। আর আমাকে বলেছিলেন, আমার চাকরিতে উন্নতি নেই, জলের ব্যবসায় কপাল খুলবে, তবে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। শেষ জীবন রোগ ভোগে কাটবে। শুনে তো দানা(বিচি) আউট। দেখতে দেখতে Stiff তো একদিন সত্যি সত্যি হুঁশ করে বিদেশ উড়ে গেলো। আর এদিকে আমি ভাবছিলাম, জ্যোতিষী হয়তো আমাকে রঙিন পানীয় এর ব্যবসা করতে বলেছেন। যেমন চিন্তা তেমন কাজ, লেগে পড়লাম কি করে কি করা যায়। বেশ কয়েক মাস ঘুরে যা বুঝলাম, রঙিন জলের ব্যবসা করতে ট্যাঁকের জোর, নেতা জোর আর বুকের জোর দরকার। আর কোনটাই আমার নেই। সব থেকে যেটা বড় সমস্যা, আমাদের অতি পবিত্র ধর্মে রঙিন জলের কারবার কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। এখানেই মাথায় বাজ!! আমি কি তাহলে আর কোন দিন বড়োলোক হতে পারবো না?

হাতে আছে জলের কারবার
ধর্মে আবার মানা,
কি করবো কি করবো
মনে দো-টানা!

অবশেষে জলের ব্যবসা বাদ পড়ে গেলো।

আজ ২০১৭, ঘরে রাখা জলের ক্যান থেকে গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে হঠাৎ খেয়াল হল সেই ২০১০ এর ভবিষ্যৎ বানী। ভবিষ্যৎ বানী তে বলা ছিল “জলের ব্যবসায় কপাল খুলবে”। মাথায় যেন বাজ পড়লো, এ কি করলাম আমি? নিজের উপরে অভিমানে, রাগে আমার কান গরম হয়ে গেলো। হিন্দি সিনেমার মত আমার হাত কাঁপতে শুরু করলো, আর কম্পমান হাত থেকে জল ভর্তি গ্লাস ঘরের মেঝেয় পড়ে ঝনাৎ করে আওয়াজ হল।

২০১০ এ বারাসাতে মানুষ কেনা জল অর্থাৎ ক্যানের জল খেত না, আর কেউ বিক্রিও করতো না। জ্যোতিষী একদম ঠিক বলেছিলেন, জলের ব্যবসায় কপাল খুলবে। কিন্ত আমি বুঝতে পারিনি। ২০১০ এ যদি আমি একটা জল প্রকল্প শুরু করতাম, তবে হয় তো আজ উন্নতির মুখ দেখতে পেতাম। ২০১৭, বারাসাতের লোক এখন কেনা জল অর্থাৎ ক্যানের জল ছাড়া খায় না। বারাসাতেই এখন ১০ থেকে ১৫টা এই প্রকল্প। জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎ বানী ছাড়াই এখন অনেকে জল বেঁচে কপাল খুলে ফেলেছে। আমার আর বড়োলোক হওয়া হল না।

Share:
Written by
Sanjay Humania
Join the discussion

1 comment
  • আহারে, আর একটু আগে ব্যাপারটা মাথায় এলে আজ আপনি কোটিপতি হতেন

Sanjay Humania

আমার নিঃশব্দ কল্পনায় দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি, আমার জীবনের স্মৃতি, ঘটনা ও আমার চারপাশের ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে লেখার চেষ্টা করি। প্রতিটি মানুষেরই ঘন কালো মেঘে ডাকা কিছু মুহূর্ত থাকে, থাকে অনেক প্রিয় মুহূর্ত এবং একান্তই নিজস্ব কিছু ভাবনা, স্বপ্ন। প্রিয় মুহূর্ত গুলো ফিরে ফিরে আসুক, মেঘে ডাকা মুহূর্ত গুলো বৃষ্টির সাথে ঝরে পড়ুক। একান্ত নিজস্ব ভাবনা গুলো একদিন জীবন্ত হয়ে উঠবে সেই প্রতীক্ষাই থাকি।
– Sanjay Humania (সঞ্জয় হূমানিয়া)