Covid এর দুই বছরে হঠাৎ করে আমি বেশ কয়েকবার একাকিত্ব অনুভব করেছি। প্রধান কারন, প্রায় সকলেই বেঙ্গালুরু ছেড়ে যে যার নিজের মাতৃ কোলে ও মাতৃ ভূমীতে ফিরে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত আমার চারপাশের মানুষগুলো আস্তে আস্তে ভয়ানক সাংসারিক হয়ে পড়েছে। এদের কাছে আপিসের ৮/৯ ঘণ্টা, ঘুম, খাওয়া, হাগা ও ধোয়া বাদ দিয়ে যেটুকু সময় থাকে, সেগুলো নাকি family time. “আমি সাংসারিক মায়াজালে এখনো আটকে পড়িনি, আমি কি বুঝবো family time?” এই উক্তি আমার না, আমার পরিচিত কিছু সাংসারিক মানুষদের।

প্রথম থেকেই আমার দল বেঁধে ঘুরতে যেতে ভালো লাগে। কিন্তু আজকাল পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, দ্বিতীয় কেউ নেই যে ক্যামেরা দিয়ে আমার একটা ছবি তুলে দেবে বেড়াতে গিয়ে। ভাগ্যিস, সেলফি আবিষ্কার হয়েছিলো এবং ফোন কোম্পানি গুলো এখন বেশ ভালো সেলফি ক্যামেরা দিচ্ছে ফোনের সঙ্গে। সুতরাং, রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত উপদেশ মাথা পেতে নিয়েছি।

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে!!”

১৬ই অক্টোবর ২০২১, শনিবার। আপিস ছুটি দুপুর দুটোয়। এবার কি করবো? মন তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে আর দুখু মিয়ার কবিতার লাইন আওড়াচ্ছে, “থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে!!”  অগত্যা, বেরিয়ে পড়লাম কাছাকাছির মধ্যে টিপু সুলতানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদের (Tipu Sultan’s Summer Palace ) উদ্দেশে। কয়েকদিন ধরে বিকালে প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে, আমি রিস্ক না নিয়ে ছোট ব্যাগে rain coat ভরে নিলাম। বাহন আমার টাট্টু ঘোড়া। চাবি লাগিয়ে কান মোড়া দিতেই চিঁহিঁহিঁ করে ডেকে উঠলো।

গুগোল করে যতটুকু জানতে পারলাম, এই গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ (Summer Palace) এর কাজ শুরু করেছিলেন হায়দার আলী খান। পরবর্তী সময়ে বাবার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করেন মহীশুরের সর্বশেষ স্বাধীন নবার টিপু সুলতান। ১৭৭৮ সালে বেঙ্গালুরুতে এই প্রাসাদ নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন হায়দার আলী। প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছিলো এটি সম্পূর্ণ তৈরি হতে। কেন এত সময় লাগলো? কারণ টিপু সুলতান এই সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং এটিই প্রধান কারণ এই গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ (Summer Palace) এর কাজ সম্পূর্ণ করতে এত সময় লাগার।

শুনেছি, গরম পড়লেই নাকি টিপু সুলতান মহীশুর থেকে চলে আসতেন এই প্রাসাদে। আমি গুনে দেখিনি, তবে গুগোল থেকে জানতে পেরেছি যে ১৬০টি কাঠের পিলার দিয়ে তৈরি এই প্রাসাদ। প্রাসাদটি দোতলা, উপরে নাকি চারটি ঘর আছে। প্রাসাদটি দুদিক খোলা। একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। দোতলায় ওঠার জন্য চারটি সিঁড়ি আছে প্রাসাদের চার কোনে। ২ দিকে ২টি ঝুলন্ত ব্যালকনি। হয়তো এখানে দাঁড়িয়ে বা বসেই তিনি রাজ দরবারের কাজ করতেন। টিপু সুলতান নিহত হলে এই প্রাসাদটি ব্রিটিশদের হাতে চলে যায় এবং এই সময়ে প্রাসাদটির জৌলুস কিছুটা কমে যায়, কারণ সেই সময়ে এই গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ (Summer Palace) ব্রিটিশদের প্রশাসনিক সদর দফতর হিসাবে ব্যাবহার করতেন ব্রিটিশরা।

প্রায় ঘণ্টা খানেক সময় নিয়ে ঘুরেফিরে দেখলাম টিপু সুলতানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ (Summer Palace)। প্রাসাদের সম্মুখে ছোট্ট একটি ফুলের বাগান দেখতে পাবেন। মোট কথা বিকালের সময়টুকু এই প্রাসাদে কাটিয়ে দেওয়া যায় স্বচ্ছন্দে। আমার বেশ ভালো লেগেছে। অনেক নাম শুনেছিলাম, শেষমেশ চোখের দেখা দেখে নিলাম।

এখানে প্রবেশ মূল্য মাত্র ২০ টাকা। তবে cash দিলে চলবে না! আপনাকে UPI বা Online payment করতে হবে। গেটে QR code দেওয়া আছে, প্রথমে scan করে আপনার নাম, ধাম ও ID proof এর নম্বর দিতে হবে। তার পর ২০ টাকা payment করলে আর একটা QR code generate হবে আপনার ফোনে। এবার সেই QR code দেখাতে হবে গেটের security guard কে। তিনি আবার তার ফোনে সেটা scan করে আপনাকে ভিতরে ঢুকতে দেবে। এর পর একটি খাতায় আপনার নাম, ধাম ও ফোন নম্বর লিখে সই করে আপনি প্রাসাদের দিকে যেতে পারেন। বেশ মজা লাগলো এই ব্যাপার গুলো করতে। আর একটা ব্যাপার আপনাদের জানিয়ে দেওয়া উচিৎ। এখানে বাইক বা গাড়ি রাখার কোন যায়গা নেই। গাড়ি বা বাইক রাখতে হলে আপনাকে একটু এগিয়ে গিয়ে SBI bank এর parking এ গাড়ি রাখতে হবে। ২ চাকা ১০ টাকা, ৪ চাকা ২০ টাকা।

আশা করি কাজ চালিয়ে নেওয়ার মত তথ্য দিতে পারলাম। আমার ব্লগ যদি একটুও ভালো লেগে থাকে, দয়া করে শেয়ার করবেন পরিচিত মানুষদের সাথে।

সঞ্জয় হুমানিয়া | বেঙ্গালুরু, ভারত
১৬ই অক্টোবর ২০২১

★ আমার লেখায় অজস্র বানান ভুল থেকে যায়, পাঠকের চোখে পড়লে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন ★

Facebook Comments Box