সেভ ভাজি

If you Like it,Share it

বেশি দিন আগের ঘটনা না, ২০১২ এর শেষের মাস, স্থান মহারাষ্ট্রের আউরাঙ্গাবাদ শহর। আমি সদ্য স্নাতকোত্তর পাস করে নতুন চাকরি নিয়ে এসেছি এই শহরে। সঙ্গে পরিচিত বলতে আমার সহপাঠী বন্ধু, নাম ভিনোদ (বাংলায় বিনোদ)। বিনোদের বাড়ি মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর (বাংলায় কোলাপুর) শহরে। ২ বছর আমারা এক সাথে সময় কাটিয়েছি স্নাতকোত্তর পড়ার সময়। চাকরির Joining লেটার পাওয়ার ২ দিনের মধ্যেই বারাসাত থেকে আমি আউরাঙ্গাবাদ পৌঁছে গিয়েছিয়াম, বন্ধু বিনোদ কোলাপুর থেকে এসেছিল।

সরকারী অফিস, কিন্তু আমার বেসরকারি কর্মচারী, আমদের চুক্তিমূলক চাকরি (contractual job). বড় বড় সরকারী অফিসে যারা বড় বড় সাহেব পদ নিয়ে বড় বড় ভুঁড়ি নিয়ে কাঠের চেয়ারে বসে শুধু মাত্র উফ উফ করে। তারা অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে আমাদের মত কিছু হতভাগ্যাদের চুক্তিমূলক চাকরি দেয়, এবং আমরা নিজের নিয়তি ভেবে সেই কাজ মুখ বুজে করে যাই। বড় বাবুরা (সাহেবরা) অফিসে তো আসেন, কিন্তু নিজের কাজ করতে খুব অনীহা, আর এই অনীহাই আমাদের মত মানুষদের চাকরি পাওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। যাই হোক, আমার আজকের এই স্মৃতি সরকারী কর্মচারীদের নিয়ে না, সেটা অন্য একদিন বলবো।

অফিসে প্রথম দিন গিয়েই শুনতে হল – “সাহেব আজ আসেনি, তোমাদের একটু বসতে হবে”। আমাদের joining হয়ে গেল ৪, ৫ ঘণ্টা বসে বসে অপেক্ষা করারা পর। আমার সাহেবের উপরে যে সাহেব ছিলেন, তিনি আমাদের নিযুক্ত করলো চাকরিতে। পুরুষ মানুষের বেতন আর নারীর বয়স কোন দিন জিজ্ঞাসা করতে নেই, তাই আমিও এখানে কিছু লিখছি না। প্রতি মাসে ৫০০ টাকার বিনিময়ে একটা সরকারী কোয়াটারও পেলাম, খাওাদাও নিজের পয়সায় ক্যান্টিন থেকে করতে হবে। আমারা দুই বন্ধু এক নতুন সংসার শুরু করলাম। দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে দুজনে দুটি full meal গো গ্রাসে খেয়ে ফেললাম। রুমে ফিরে টানা ঘুম সন্ধ্যা পর্যন্ত।

নীল প্যান্ট আর আকাশী রঙের জামা, uniform কিনতে হবে আমাদের। সন্ধ্যায় বেরলাম দুজনে, নতুন যায়গা ঘরাঘুরি করে কেনাকাটা শেষ করলাম। আজা রাতে আর ক্যান্টিনে খাবো না, বাইরে কথাও খাবো। বিনোদ তো রুটি খাবে, আমি ও আর কিছু ভাবলাম না। সস্তা একটা রেস্তরা খুজে বসে পড়লাম। বিজ্ঞের মত মেনু কার্ড দেখতে লাগলাম। বিনোদ আর আমি কি একটা পরামশ করে “সেব ভাজি” আর রুটি খাওয়ার মনঃস্থির করলাম। মনে মনে ভাবলাম, কি বিচিত্র এই দেশ, আমারা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সখ করে কিম্বা অসুস্থ হয়ে বাড়ি শুয়ে থাকলে আপেল (সেভ) খেতে পাই, আর এখানকার মানুষ রুটি দিয়ে আপাল ভাজা (সেভ ভাজি) খায়। সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ।

কিছুক্ষণ পরে খালি থালা এলো, একটি পাত্রে চাপাতি (অল্প তেলে ভাজা রুটি) এলো, একটি পাত্রে কাটিভাজা এলো, একটি পাত্রে একটা কিসের যেন ঝোল এলো, ঝোলের উপরে তেল চুকচুক করে ভাসছিলো। এদিকে আমি কি সব ভেবেই চলেছি নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে, আর ঠোটের কোনে মৃদু হাসি। চেয়ে দেখলাম বিনোদ খাওয়া শুরু করে দিয়েছি, ঝোলের মধ্যে কাটিভাজা ছড়িয়ে দিয়ে রুটি ডুবিয়ে ডুবিয়ে খাচ্ছে, চোখে মুখে ওর দারুন তৃপ্তির ছাপ। আমি চুপচাপ ওকে দেখছি, আর অপেক্ষা করছি। ২ টো রুটি শেষ করে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, “ক্যয়া হুয়া, খানা কিউ নাহি খা রাহা হে?”। আমি বললাম, সেভ ভাজির জন্য অপেক্ষা করছি, কাটিভাজা আমার ভালো লাগে না। বিনোদ অবাক হবে বলল, এটাই তো সেভ ভাজি। কাটিভাজার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললো, এটা “সেভ” আর ঝোলের দিকে আঙ্গুল দিয়ে বললো, এটা মিক্স করলে হয়ে যাবে “সেভ ভাজি”।

আমি অতি স্বাভাবিক ভাবে একটা ঢোক গেলার চেষ্টা করলাম, যাতে বিনোদ অস্বাভাবিক কিছু না দেখতে পায় আমার মধ্যে। সে রাতে আমার আর আপেলের ভাজি খাওয়া হলো না। সেভ ভাজি আর রুটি খেয়ে ঘরে ফিরলাম।

Comments and suggestion always welcome


Leave a Reply

Sanjay Humania

Everyone's life is a story, it starts when you're born and continues until the end.

Categories
Facebook Page

Follow @Social Media
Notes Archives
Visitors Statistics
Sanjay Humania’s Notebook
%d bloggers like this: