Ramadevara Betta, Ramanagara | রামাদেবরা বেট্টা, রামানগরা

রামানগরা বা রামনগর ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রামানগরা জেলার সদর শহর। ব্যাঙ্গালোর থেকে আনুমানিক ৫০/৫৫ কিলোমিটার দূরে। ব্যাঙ্গালোর থেকে যাতায়াতের জন্য বাস এবং ট্রেন প্রায় সবসময়ই পাওয়া যায়। বিখ্যাত ১৯৮৫ সালের বলিউড সিনেমা শোলে এই রামানগরার পাহাড়ে শ্যুট করা হয়েছিল, যাকে এখন রামদেবরা বেট্টা বা রামদেবরা পাহাড় বা রামদেবের পাহাড় নামে পরিচিত।

টিপু সুলতানের শাসন আমলে শহরটি নাম ছিল শমসেরবাদ। স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে স্যার ব্যারি ক্লোজ / Sir Barry Close এর নাম অনুশারে এই যায়গার নাম ছিল ক্লোজপেট। স্বাধীনতার পরে ক্লোজপেটের নাম বদলে রামায়ণের ঐতিহাসিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে নামকরণ করা হয়েছিল রামনগরা, অর্থাৎ ভগবান রামের নগর।

১৭/০৭/২০২২ রোববার সকাল সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত আমার কোন প্লান ছিল না কোথাও যাওয়ার। সাধকরণত আমি চেষ্টা করি শনিবার বা রোববার কোনো কাজ না থাকলে কাছেপিঠে কোথাও ঘুরে বেড়াই। হথাৎ ফোন ঘাটাঘাটি করতে করতে উঠলো বাই তো কটক যাই। বহুবার এই রামানগরার উপর দিয়ে মাইসোর বা কূর্গ গিয়েছি, কিন্তু রামানগরা কোনোদিন থেমে ঘুরে দেখা হয়নি। সকাল ১১টায় তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম রামানগরার উদ্দেশ্যে। এই দুর্মূল্যের বাজারে সাপ্তাহিক ৮ লিটার পেট্রোল ভোরলাম আমার টাট্টু ঘোড়ায় এবং ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম।

রামানগরায় উল্লেখযোগ্য দেখার যায়গা হলো Ramadevara Betta / রামদেবরা বেট্টা বা ভগবান রামের পাহাড়। ব্যাঙ্গালোর থেকে একটি দিনের ছুটি কাটানোর জন্য উপযুক্ত এই স্থান। হিন্দি সিনেমা শোলে এর শুটিং এই পাহাড় ও আশেপাশে করা হয়েছিল। হ্যাঁ! এটি সেই জায়গা যেখানে গাব্বর দাপিয়ে বেড়িয়ে ছিল রূপোলী পর্দায়, সাম্ভা বন্দুক নিয়ে বসে থাকতে এই পাহাড়ের কোনো এক পাথরে। রামদেবরা বেট্টার আরেকটি পৌরাণিক ইতিহাস আছে। তবে খুব কম লোকই জানেন যে জায়গাটির হিন্দু পুরাণেও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। রামদেবরা বেট্টা মানে ভগবান রামের পাহাড় এবং এই পাহাড়ের চূড়ায় ভগবান রাম, হনুমান, গণেশ এবং শিব পার্বতীর মূর্তি সহ ২/৩টি ছোট মন্দির রয়েছে। মন্দিরগুলি রামায়ণের সময়কালের বলে মনে করা হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে ভগবান রাম অসুর সুকাসুরকে বধ করতে সুগ্রীব কে সাহায্য করার এবং পর সুগ্রীব এখানে এই মন্দিরে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেঙ্গালুরুর প্রতিষ্ঠাতা কেম্পেগৌড়া মহাশয়ের দ্বারা সংস্কার করা হয়। কেম্পেগৌড়া এখানে একটি দুর্গও তৈরি করেছিলেন। মন্দিরে তীর্থযাত্রীদের জন্য প্রায় ৪০০ ধাপ উপরে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। সীতার পুকুর নামে আরেকটি আকর্ষণ রয়েছে এই রামদেবরা বেট্টা বা ভগবান রামের পাহাড়ে। লোকমুখে প্রচলিত যে কেউই জানে না এই সীতার পুকুর কতটা গভীর।

বেঙ্গালুরু থেকে আমার নাইস রিং রোড হয়ে মাইসোর রোড, তারপর সোজা বিদাদি। তার পর বিদাদি থেকে সোজা রামদেবরা বেট্টা।

বেঙ্গালুরু থেকে রামানগরা বাস বা ট্রেনের মাধ্যমে পৌঁছানো যায়। রামাদেবরা বেট্টা দেখার সেরা সময় সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ। সকাল ৯টায় খুলে দেওয়া হয়ে প্রবেশ পথ। প্রাপ্তবয়স্ক মাথা পিছু প্রবেশমূল্য মাত্র ২৫/- টাকা এবং বাইক রাখার জন্য মাত্র ১০/- টাকা। এন্ট্রি গেট থেকে পার্কিং স্পটে পৌঁছতে আরও ১ কিলোমিটার। পার্কিং থেকে একটু এগিয়েই উপরে ওঠার ধাপ শুরু হয়ে যায়। প্রায় ৪০০টি ধাপ রয়েছে এখানে এবং এই ধাপ উঠলেই মন্দির ও সীতার পুকুর। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন দেখলাম এখানে মধ্যাহ্ন ভোজন শুরু হয়ে গিয়েছে। হা, এখানে মন্দির দর্শনার্থীদের জন্য মধ্যাহ্ন ভোজনের সুব্যবস্থা আছে। মন্দিরটি ছোট কিন্তু সুন্দর, এই জায়গাটিতে প্রচুর গাছ রয়েছে এবং মনে হবে আপনি একটি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটছেন।

খেয়েদেয়ে আমারা অগ্রসর হলাম আরও উপরে যাওয়ার জন্য। পাহাড়ের চূড়ায় একটি ছোট সমতল খোলা জায়গা আছে। বাচ্চা ও বয়স্ক লোকদের উপরে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি না কারণ এই অংশটি খুব খাড়া এবং উপরে ওঠা খুব বিপদজনক। তবে তরুণদের জন্য এটা কোনো সমস্যাই নয়। এই বড় পাথরের পাহারের উপরে ওঠার জন্য খোদাই করা ছোট ছোট পা রাখার ধাপ এবং পাশে রয়েছে লোহার রেলিং আছে। সাবধানে পা ফেলে, রেলিং ধয়ে উপরে উঠে আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে। পাহাড়ের চূড়া থেকে আশেপাশের দৃশ্য আশ্চর্যজনক ভাবে সুন্দর। আমি উপরে থাকা অবস্থায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলো, কিন্তু উপরে মাথা গোঁজার তেমন কিছু নেই, কয়েকটি ফনিমনসা কাঁটার ঝোপ ছাড়া। আমার কাছে রেইন কোট ছিলো, আমি সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেটা পরে ফেললাম, কি মজা। বৃষ্টি থামলে উপর থেকে খুব সাবধানে পা টিপে টিপে সেই পাথরের পাহারের গায়ে খোদাই করা ছোট ছোট পা রাখার ধাপে পা রেখে লোহার রেলিং ধরে নিচে নামলাম। বেশ একটা থ্রিলিং ব্যাপার অনুভব করলাম শরীর ও মনে।

প্রকৃতি কে ভালোবাসে এমন মানুষরা এখানে যেতে পারেন, একা বা পরিবারের সাথে। হাঁটুর সমস্যা থাকলে এখানে আসবেন না। জল এবং জলখাবার সঙ্গে রাখুন কারণ পাহাড়ের উপরে কিছু পাবেন না। অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন এখানে মন্দিরের কাছে মাত্র একটি টয়লেটর সুবিধা আছে আর মন্দিরের কাছে হাত ধোয়ার জন্য একটি ট্যাপ আছে। সুন্দর সময় কাটান, প্রকৃতি বাঁচান, নিরাপদ থাকুন, যেখানে সেখানে প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলবেন না কোথাও বেড়াতে গিয়ে।

সঞ্জয় হুমানিয়া | বেঙ্গালুরু, ভারত
১৭ই জুলাই ২০২২

★ আমার লেখায় অজস্র বানান ভুল থেকে যায়, পাঠকের চোখে পড়লে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন ★

Facebook Comments Box