আমার ছোটবেলায় অমাবস্যা আর কালীপূজা ছিল এক বিভীষিকা। ছোটবেলায় জানতাম যে এই অমাবস্যা হলো গলাকাটা অমাবস্যা। দূপুরের আগেভাগে আমার ডান হাতে সাদা সুতো দিয়ে ঝোলানো হয়তো চুল-কাটা গাছের শিকড়। শুধু আমার না, গ্রামের প্রায় সব বাচ্চা-কাচ্চাদের হাতে। এই শিকড়ে এমন অলৌকিক শক্তি আছে যা আমাকে এবং আমার মত বাচ্চা-কাচ্চা কে রনে বনে জলে জঙ্গলে রক্ষা করবে এক অজানা ভয় থেকে। শিকড় দিতেন আমাদের এক প্রতিবেশী বৃদ্ধা।

আমাকে বলা হয়েছিল এবং আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করতান যে, এইদিন কিছু তান্ত্রিক বা দুষ্টু লোক ভালো মানুষ সেজে বাংলার গ্রাম গঞ্জে বাচ্চাদের চুল কেটে নিতে বেরিয়ে পড়তো। যে বাচ্চার চুল কাটা পড়বে, সে নাকি রক্ত বমি করে মারা যাবে। দুই তিন দিন আগে থেকেই আমার মধ্যে এই ভয় ডানা বাঁধতে শুরু করতে। ওই দিন সকাল থেকে আমার গা ছমছমে ভাব। বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ে জামরুল গাছ তলায় গেল বুক কেঁপে উঠতো আমার। শুধু মনে হতো, এই বুঝি কেউ আম বাগানের পায়ে হাটা পথ ধরে লুকিয়ে তান্ত্রিক বা দুষ্টু লোক এখানে এসেই কাঁচি দিয়ে কচ করে আমার একটু চুল কেটে নিয়ে দৌড় দেবে। সেদিন দুপুর রোদেও টোটো করে এ আম বাগান ও জাম বাগান ঘুরে বেড়ানো বন্ধ। শুধু অধীর হয়ে অপেক্ষায়, কখন চুল কাটা গাছের শিকড় আমার হাতে রক্ষা কবজ হয়ে বাধা হবে আর আমি বেঁচে যাবো সে দিনের মতো।

বিকালের পর থেকে আর এক ভয় ডানা মেলতে শুরু করতো। শুনেছিলাম এই গলাকাটা অমাবস্যার রাতে যদি কারো পায়খানা পায়, তবে তার সারা জীবন রাতেই পায়খানা পাবে। সে সময় এ কথা ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতো। আপনারা পাঠকরা হয়তো বলবেন এতে ভয়ের কি আছে/ আগেকার দিনে গ্রামে বাসভবন থেকে কিছুটা দূরে জলের চাপা কল সহ পায়খানা ঘর করা হতো। এই ধরুন মূল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাঁচ দশ পা দূরে। হয়তো বাগানের দিকে বা বাড়ির পিছনে। সন্ধ্যার পরে সে জায়গায় একটু গা ছমছমে ভাব থাকবেই। আমাদেরটা ছিল বাড়ির বাইরে, জামরুল গাছ আর পুকুর এর পাসে। সন্ধ্যার পরে এখানে যেতে হলে হ্যারিকেন বা লম্প।

৮০র দশকের শেষের দিকে, আমাদের পাড়াগাঁয়ে তখন বিদ্যুৎ আলো পৌঁছায়নি। গ্রামের প্রত্যেক বাড়িতে কম করে দুটি হ্যারিকেন ও গোটা চারেক লম্পই সম্বল। সে সময় রাতবিরেতে বাইরে যেতে হলে হ্যারিকেন নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো। লম্প তো হওয়া এলেই নিভে যায় আর বুক ধড়াস করে ওঠে। কি জানি, সত্যি কি হওয়া ? নাকি কোনো অদৃশ্য কেউ ফু দিয়ে নিভিয়ে দিতো।

সঞ্জয় হুমানিয়া
অক্টোবর ২৭, ২০১৯ – বেঙ্গালুরু

★ আমার লেখায় অজস্র বানান ভুল থেকে যায়, পাঠকের চোখে পড়লে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন ★

Facebook Comments Box