জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখ হিসাব নিকাষ কিছুই রবে না

কাঠের বাস আর জর্দা পানের গন্ধ

ভালো লাগলে শেয়ার করবেন

সময়টা আমার ছেলেবেলা, দুপুরের ঝাঁ চকচকে রোদ্দুর, সবে মাত্র দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ করে, পাড়া কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। পুকুর পাড়ে ঝিরঝিরে হাওয়া, আম বাগানে শনশন শব্দ, মাঝে মাঝে কোকিলের ডাক, নারকোল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের ঝিকিমিকি।

চড়ুইগাছি গ্রাম, পোস্টঅফিস ধর্মপুর (ধরমপুর), থানা গাইঘাটা। কাছাকাছি টাউন বলতে হাবরা। চোখ মেলে থেকে দেখছি দাদুর তৈরি বাড়ি, বাড়ির সামনে চৌক উঠোন, উঠনের পশ্চিম দিকে খিড়কির দরোজা। দুই পাল্লার দরোজা, কাঠের ফ্রেমের মাঝে টিন লাগানো। টিনে অনেক জায়গায় ছোট ছোট ছিদ্র, ছিদ্র গুলি আগে থেকেই ছিল। হয়তো টিনটি আগে অন্য কথাও ব্যাবহার করা হয়েছিল, পরে সেটা দিয়ে আবার দরোজা বানানো হয়েছে।

খিড়কির দরোজায় একটা জরাজীর্ণ তাল কাঠের খিল ছিল। খিল লাগানো আর খোলার সময় টিনের দুই পাল্লার এখনো সমান ভাবে আওয়াজ করে। খিড়কির দরোজা পার করলেই বুড়ো জামরুল গাছ, কত পুরনো জানি না, হয়তো আমার দাদুর আমলের। জামরুল তলা বেশ বড়, জামরুল গাছের মোটা মোটা শেকড় ছারিদিকে ছড়িয়ে আছে, শেকড়গুলি এমই মোটা যে তার উপরে আরাম করে বসে থাকা যায় পা ভাজ করে। পাশেই মস্ত বড় এক পুকুর। পাড়ার মানুষ জন এটাকে বড় পুকুর বলেই ডাকে। জামরুল গাছের শেকড়ের উপরে বসে অনায়াসেই ছিপ দিয়ে পুকুর থেকে মাছ ধরা যায়।

আম বাগান উত্তর দিকে, পুকুর দক্ষিন দিকে আর এরই মাঝখনা দিয়ে পুকুরের গা ঘেঁষে শরু মানুষ হেটে যাওয়ার পথ। জামরুল গাছটা ঠিক পুকুরের উত্তর-পূর্ব কনে, যেখান থেকে ওই শরু পথটি শুরু। আম বাগান আর পুকুর দুই পাশে ফেল এগিয়ে গেলেই ধানের খেত। ধানের খেতের মাঝখান দিয়ে, আল এর উপর দিয়ে একটু গেলেই পাকা রাস্তা, যশোর রোড। ধানের খেত মানে দিগন্ত জোড়া কোন মাঠ না এটা, পুকুর আর পাকা রাস্তার মাঝে ছোট একটা ধানি জমির মাঠ। আড়াআড়ি পার হতে লাগে মিনিট তিন।

আমাদের গ্রামের মানুষদের বিশেষ কিছু কেনাকাটা, ডাক্তার দেখানো বা অন্য কোন কাজের জন্য প্রায়ই হাবরা যেতে হয়। হাবরা যাওয়ার বাস ধরার জন্য এই মেঠো পথটি হল শর্টকার্ট। অন্য প্রধান মাটির রাস্তা আছে গ্রামের মধ্য দিয়ে একে বেঁকে উঠেছে গিয়ে সেই ধর্মপুর বাজারে। যদি ধর্মপুরে যাওয়ার হয়, তবাই আমরা এই পথ ব্যাবহার করি, আর যদি হাবরা যেতে হয় তবে এই শর্টকার্ট ব্যাবহার করি।

আমাদের হাবরা যাওয়ার আদর্শ সময় হল এই ভর দুপুর বেলা। খাওয়াদাওয়া করে শুরু হয়ে যেত আমাদের হাবরা যাওয়ার প্রস্তুতি। প্রথমেই আমার গাল আলতো করে টিপে ধরে চিরুনি দিয়ে বাম দিকে সিঁথি কেটে মাথা আঁচরে দেবে, তার পর আঙ্গুলে করে কাজল নিয়ে আমার দুই চোখে বেশ মোটা করে পরিয়ে দেবে মা। কপালের ডান কোনে একটা কাজলের টিপ, গলায় আর কাজলের টিপের উপরে Ponds পাউডারের প্রলেপ। গায়ে পাতলা সুতির জামা, ম্যাচিং করা ইলাস্টিক লাগানো হাফপ্যান্ট। পায়ে পিক পিকে লাল জুত, হাঁটলেই পিক পিক করে আওয়াজ করতো।

মায়ের কাধে কালো ব্যাগ, ব্যাগের চেনের এক কোন থেকে উকি মারতো ফল্ডিং ছাতা। আমি মায়ের হাত ধরে খিড়কির দরজা পার হয়ে জামরুল তলায়। মা খিড়কির দরজার চৌকাঠ পার হতে হতে দাদিমা (ঠাকুমা) কে দরজায় খিল দিয়ে দিতে বলতো ভিতর থেকে। জামরুল তলা, উত্তরে আম বাগান আর দক্ষিনে বড় পুকুর পার হয়ে ধানের খেতের আল দিয়ে, আগে আগে আমি পিছনে মা। তিন মিনিটেই পাকা রাস্তা, যশোর রোড। স্টপেজের নাম ‘হাসপাতাল মোড়’, আমরা বসতাম যাত্রী প্রতিক্ষালয়ে।

আমার খুঁতখুঁতানি শুরু এই এখান থকেই। যত বার আমি বলবো, “আমি বাসে যাবো না, ভ্যানে চলো”, ততবার মা বলবে এই দুপুরে ভ্যানে গেলে রোদে মাথা ফেটে যাবে। একটাই নম্বরের বাস চলতো সেই সময়, বনগাঁ থেকে সোদপুর, বাস নম্বর ৭৮E (78E)।

৭৮ নম্বর বাস, টাটা কোম্পানির তৈরি, কাঠের ফ্রেমের বাস, বাইরে অ্যালুমিনিয়ামের চাদর দিয়ে ঢাকা। ভিতরে ছাদের রঙ সাদ, কাঠের সিটের রঙ খইরি, সিটের উপরে চামড়া দিয়ে বাধান শক্ত গদি। বাসের মেঝে কাঠের, মেঝেতে কাঠের তক্তার উপরে শরু শরু কাঠের বাতা লাগানো থাকতো লম্বা ও আড় করে। এই কাঠের বাতা এমনি কায়দায় পাশাপাশি লাগানো থাকতো যে, সেই আমলের বড় একটাকার কয়েন যদি এই কাঠের বাতার মাঝে একবার ফেঁসে যায়, তা আর তোলা যেত না।

বাসের সব সিট উইন্ডো সিট, কারো কোন তাড়া নেই আলাদা করে উইন্ডো সিট ধরার। সব সিট জানালার দিকে পিছন করে লম্বা লম্বা বসার যায়গা। শুধু মাত্র দুটি কাটা সিট ঠিক বাসের মাঝখানে থাকতো দুই পাশে, এক সাথে দুজন দুজন করে দুদিকে বসা যেত। বাস ড্রাইভার এর ঠিক পিছনে উল্টো করে লম্বা সিট, সেটা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। আমার আর মায়ের টার্গেট থাকতো এই সিট। যদি খালি পাওয়া যেত, মা আমাকেও বসিয়ে দিতো, আর যদি খালি না থাকতো, আমি মায়ের কোলে। আর যদি মা ও বসার যায়গা না পেতো, মা দাড়িয়ে আর আমি বাসের সামনের দরজার ঠিক পাশের একটা ছোট্ট দাঁড়ানোর যায়গায় দাড়িয়ে পরতাম।

আমার চোখের নিচে কালো হতে শুরু করতো, কারণ দুপুরবেলা রোদ ঝাঁঝাঁ করছে, আমি ঘামতে শুরু করতাম। এর মধ্যেই খুব সতর্ক ভাবে মায়ের কাছ থেকে টিকিট নিয়ে নিজের জামার পকেটে রাখতাম।

কোন কোন দিন বাসে খুব ভিড় হতো, চাপাচাপির মধ্যে আমি মায়ের কোলে। এই ভিড়ে আমার সব থেকে অসহ্য লাগতো কেউ যদি জর্দা দিয়ে পান খেয়ে উঠতো। একবার ভেবে দেখুন দুপুরে প্রচণ্ড রোদ্দুর, গরম, ঘাম দিচ্ছে, আর আপনি এক ভিড় বাসে, বাসে কেউ জর্দা পান চেবাচ্ছে। বাস ময় সেই সুরভী কিম্বা গোপাল জর্দার গন্ধ, আমার মাথা টিক টিক শুরু হয়ে যেত।

ভালো লাগলে শেয়ার করবেন
Avatar
Written by
সঞ্জয় হুমানিয়া
Join the discussion

Please note

This is a widgetized sidebar area and you can place any widget here, as you would with the classic WordPress sidebar.