কেন আমি আর ভিক্ষা দেই না!! ★ বেঙ্গালুরু

If you Like it,Share it
কেন আমি আর ভিক্ষা দেই না!!
উত্তরটি দেওয়ার আগে ছোট একটি ঘটনা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। ঘটনাটি ব্যাঙ্গালোরের।
২০১৯ এর মে মাসে এবার রমজান শুরু হয়েছিল। আমি নিজে তেমন ধর্মকর্ম করি না, তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সমান ভাবে অংশগ্রহণ করি, কারন আমি ভোজন রসিক। এক বিকালে আমার এক বন্ধু ফোন করে বলল যে, সেদিনের ইফতার সে আর আমি ব্যাঙ্গালোরের মসজিদ রোড নামক এলাকায় ‘হালিম’ খেয়ে করবো। এক কথায় আমি রাজি। ব্যাঙ্গালোরের দুই প্রান্থ থেকে দুজনে এসে জুটলাম মসজিদ রোডে। এখানে রমজান মাসে রীতিমত একটা খাবারের মেলা বসে। দেশী, বিদেশী, দামী, সস্তা, আমিষ ও নিরামিষের বিশাল সম্ভার।

মসজিদ রোডে পৌঁছানো মাত্রই আযান কানে এলো, ইফতারের আর বেশি সময় নেই। বন্ধুর স্কুটি মসজিদের সামনে থামিয়ে ও তাড়াতাড়ি মসজিদে ধুকে পড়লো। আমি আর স্কুটি বাইরে দাড়িয়ে। চারিদিক গমগম করছে, দোকানে ও রাস্তায় জনসমুদ্র। খাবারের কোন ধর্ম বা জাত হয় না, এই কথাটি সত্যি। এখানে এলে এই সত্যির প্রমান পেতে পারেন হাতেনাতে ও চোখেচোখে। নামাজের সময় মসজিদের ভিতরে যতটা ভিড়, তার থেকে বেশি ভিড় খাবারের দোকানে।

আমি আর স্কুটি এই সব দেখছি তন্ময় হয়ে। অমনি খেয়াল করলাম আমার পাশে এক মধ্য বয়স্ক মহিলা ও একটি বাচ্চা এসে দাঁড়িয়েছে। কানাড়া ভাষায় আমাকে কি সব বলছে। অনেক্ষন শোনার পরে কিছু বুঝতে না পেরে বলালাম, “হিন্দি!! হিন্দি!!”। তখন তিনি পরিস্কার দক্ষিণ ভারতীয় টানে হিন্দিতে বলতে শুরু করলেন।

“দো দিন সে কুছ নাহি খায়া, সাহাব! কুছ দিজিয়ে”।

আহারে!! এটা শোনার পর আমার ভিতরের ভালো মানুষটি জেগে উঠেই নিঃশব্দে কেদে ফেললো। আমি অতি বিনয়ের সাথে তাদের কে সঙ্গে নিয়ে একটি খাবারের দোকানে গেলাম। ইফতারের জন্য নানা ধরনের ফল কেটে বিক্রি করছে, সঙ্গে ঠাণ্ডা সরবত। আমি দুজনের জন্য দুই প্লেট কাটা ফল ও দুই গ্লাস সরবত কিনে ওদের দিতে বললাম।

আমার সামনে দুজনেই সরবত পান করলো, আর আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফলের পাত্র নিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিসে গেলো। আমি তৃপ্তি অনুভব করলাম। কিন্তু আমার এই তৃপ্তি বেশীক্ষণ স্থায়ি হয়নি। মাত্র কয়েক মিনিট পরেই ভিড় একটু কমলে দেখলাম আমার থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার ওপারে সেই বাচ্চাটি মাথা নাড়ছে আর তার নিজের হাতের ফলের পাত্র তার মা রূপী মহিলাটার কাছে দিতে চাইছে। আমি একটু গাছের আড়ালে গিয়ে ঘটনাটি বুঝতে চেষ্টা করলাম। মহিলাটি নিরুপায় হয়ে বাচ্চাটির হাত থেকে ফলের পাত্র নিয়ে নিলো। দু হাতে দুটি ফলের পত্র নিয়ে একটু অপ্রস্তুত ভাবে কিছুক্ষন এদিক ওদিক দেখলেন। তারপর দোকানের বাইরে রাখা ডাস্টবিনে দুটি ফলের পাত্র ফেলে দিলেন।

আমি অবাক! দুদিন না খেতে পাওয়া মানুষ কিভাবে এমন কাজ করতে পারে? এটাও কি সম্ভব? আমার এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে বেশি সময় লাগলো না। আমার চার পাশে তখন সব কিছু নাটকীয় মনে হচ্ছে, আমি যেন শুধু মাত্র একজন দর্শক। মসজিদে নামাজ শেষ হয়েছে। মসজিদ থেকে জনস্রোত এসে রাস্তায় মিশে যাচ্ছে। আমি তখনো সেই একই যায়গায় দাড়িয়ে। মহিলাটি এবার একা দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হয়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসা জনস্রোতের পাশে এসে অন্য ভিক্ষারিদের সঙ্গে লাইনে দাড়িয়ে পড়লো।

রমজান মাস দানের মাস। সকলে হাত খুলে দান করে। জনস্রোত হাত খুলে ডান করছে, ১০ টাকা ২০ টাকা ৫০ টাকা ১০০ টাকা। ইফতারের ফল দিয়ে দুদিনের পেটের খিদে আমি মেটাতে পারিনি, কিন্তু এই টাকা সে খিদে মিটিয়ে দিয়েছিল সেদিন। আমার নানাজী, অর্থাৎ মায়ের বাবা, মাঝে মাঝে কিছু এমন কথা বলতেন যা আমার মস্তিস্কে দাগ কেটেছিলো। এমনি সব কথার মধ্যে একটি কথা আপনাদের সকল কে জানানো প্রয়োজন।

নানা বলতেন –

“ টাকা পয়সা দিয়ে লোকের মনে তৃপ্তি দেওয়া যায় না। কাউকে নিমন্ত্রণ করে বসিয়ে একদিন খাইয়ে দেখো, দুজনেই তৃপ্তি পাবে”।

উপরের ঘটনাটি দেখার পরে আমি অনেক চিন্তা করেছিলাম। কোনটা ঠিক? নানার কথা, নাকি যেটা দেখলাম? উত্তরের আশায় রইলাম, আপনাদের মতামত চাই।

Avatar
Written by
সঞ্জয় হুমানিয়া
Join the discussion