জনপদ লোক – A Journey Through Janapada Loka

জনপদ লোক – A Journey Through Janapada Loka

বেশ কয়েক বছর ধরে আমাকে ভ্রমণের নেশায় ধরেছে। শুনছি, মানুষ কোন কাজ করতে বাধা দেওয়া হলে, স্বাভাবিক ভাবেই নাকি মানুষ তার প্রতি এক গভীর আকর্ষণ অনুভব করে। আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবন কেটেছে অনেকটা অমলের মত। অমল কে? এটাই ভাবছেন তো? কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী চিরতরুণ চরিত্র ‘অমল’। খেলা-ধুলো, ঘোরা-ঘুরি, আড্ডা-রকবাজি কিছুই ছিল না আমার জীবনে। অত্যন্ত সাদামাটা জীবন, খাওয়া দাওয়া ঘুমানো। সেই জন্যই হয়তো আমার শারীরিক বিকাশ ঘটেনি ঠিকঠাক। আজও আমার শরীরের তুলনায় হাত-পা গুলো শরুশরু। অনেক ডাম্বেল টাম্বেল উঁচিয়ে দেখেছি এই মধ্য বয়সে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।

আজ এই মধ্য বয়সে এসে আমি নেশগ্রস্থ, ভ্রমণের নেশা আমাকে ঘিরে ধরেছে। ছুটি পেলেই মনটা কেমন পালাই পালাই করে। গত শুক্রবার আপিসে বসে মাথা ঘামাচ্ছিলাম পরের দিন শনিবার কোথায় যাওয়া যায় নিয়ে। বন্ধুবান্ধবরা আজ সবাই সংসারী, সংসারের জাঁতাকলে সকলেই প্রায় আটকা পড়েছে। নির্লজ্জের মত কাউকে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বললেই, তারা হা-রে রে-রে রে-রে করে আমাকে আক্রমণ করে। তাদের বক্তব্য,

“বিয়ে তো করোনি চাঁদু, সংসারের জ্বালা তুমি কি বুঝবে হে!!”

অগত্যা, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবেই নাকি একলা চলতে হয়…!

আপনি কি কখনও দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি জানার চেষ্টা করেছেন? ব্যাঙ্গালোর থেকে ৫৩ কিমি দূরে কর্ণাটকের রামনগরে (Ramanagara) অবস্থিত জনপদ লোক। এটি দক্ষিণ ভারতের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। এটি বহু শতাব্দী ধরে বিদ্যমান লোককাহিনী এবং ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতিকে সকলের কাছে তুলে ধরার দুর্দান্ত একটি প্রচেষ্টায়।

এ মাসের (ডিসেম্বরের) ১৭ তারিখে আমি গিয়েছিলাম ‘জনপদ লোক’ যা ইংলিশ লিখলে Janapada Loka. বেঙ্গালুরু থেকে মাইসোর যাওয়ার পথে রামনগর (Ramanagara) পড়ে, যেখানে শোলে সিনেমার শুটিং হয়েছিলো। এই রামনগরেই অবস্থিত জনপদ লোক বা Janapada Loka.  যায়গাটির খবর অবশ্য আমি ফেসবুকের একটি গ্রুপ থেকে পাই। পর অবশ্য গু-গুলে খুঁজে বুঝলাম যায়গাটায় যাওয়া যেতে পারে। সঙ্গী-টঙ্গী কেউ নেই, আমি আর আমার টাট্টুঘোড়া।

সকালে উঠে দাঁত মেজে, স্নান কর্‌ লেমন রাইস খেয়ে আমি প্রস্তুত। আমার টাট্টুঘোড়াও তৈরি, গত রাতে আপিস ফেরার পথে ফুল ট্যাঙ্ক তেলে খাইয়ে পেট ফুলিয়ে রাখা আছে। ঘর থেকে এই ধরুন সকাল ১০টা নাগাদ রওনা দিলাম। সোজাসুজি না গিয়ে ইলেক্ট্রনিক্স সিটি গেলাম। ওখান থেকে NICE road নিয়ে সোজা মাইসোর রোড, তারপর সোজা রাস্তা রামনগর (Ramanagara)। তবে মাঝে একটু অসতর্ক হয়ে পড়ার জন্য ১০-১৫ কিলোমিটার একটু বেশি ঘুরতে হয়েছিলো।

বেঙ্গালুরু – মাইসোর হাইওয়ে ফাঁকা পেয়ে আমি রামনগর (Ramanagara) ঢোকার আগে বাম হাতের রাস্তা না নিয়ে সোজা বেরিয়ে গিয়েছিলাম। এদিকে বেঙ্গালুরু – মাইসোর হাইওয়েতে সাইডে কোনও কাট নেই বা U turn নেওয়ার যায়গা নেই। প্রায় ২০ কিলোমিটার গিয়ে U turn নিয়ে ফিরতে হবে। এই দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। পেট্রোলের যা দাম। অন্য দিকে মাইসোর হাইওয়ে ফাঁকা রাস্তা পেয়ে মন ভালোও হয়ে গেলো। টাট্টুঘোড়া চিতার মত ছুটছে U turn নিয়ে ফিরতে।

৪-৫ কিলোমিটার যাওয়ার পরে হঠাৎ চোখে পড়লো বাম দিকের লোহার তারের বেড়া ছিঁড়ে পড়ে আছে। আমিও ক্যাঁক করে ব্রেক কোষলাম। হ্যাঁ, সত্যি তাই। কোনও এক বড়ো গাড়ি এসে ধাক্কা মেরে লোহার তারের জাল ছিঁড়ে ফেলেছে। ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা হয়েছে তার চিহ্ন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। এদিকে স্থানিয় মানুষ আসা যাওয়ার জন্য একটা রাস্তাও বানিয়ে ফেলেছে। আমি সুযোগের সৎ ব্যাবহার করলাম। এখানেই U turn নিয়ে নিলাম। যেই না U turn নিয়ে সার্ভিস রোডে এলাম, ওমনি আমার গন্তব্য ২৯ কিলোমিটার থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার হয়ে গেলো। কি যে মজা!

জনপদ লোকে পৌঁছে আমার উত্তেজনা কমে গেলো। আশা করেছিলাম প্রচুর ভিড় থাকবে, কিন্তু এ তো হাঁহাঁ খাঁখাঁ। এখানে একটা কথা বলে রাখি, জনপদ লোকে গাড়ি বা বাইক রাখার parking নেই। প্রবেশ পথের দুপাশে আপনাকে নিজের দায়িত্বে নিজের বাহন রেখে ভিতরে প্রবেশ করতে হবে। প্রবেশ মূল্য মাত্র ৫০ টাকা। DSLR নিয়ে প্রবেশ করলে ৫৫০ টাকা, iPhone বা ফোন নিয়ে প্রবেশ করলে আলাদা কোন মূল্য দিতে হবে না। একটা কথা আমি বুঝলাম না, আজকাল DSLR এর থেকে iPhone এ ভালো ছবি তোলা যায়। শুনেছি অনেকেই অনেক তথ্যচিত্র বা short film iPhone বানিয়ে ফেলছে। iPhone এর অবাধ প্রবেশ সব যায়গায়।

যাইহোক ৫০ টাকা দিয়ে ঢুকলাম। ঢুকেই দেখলাম সোজা পথ এগিয়ে গিয়েছে সামনে। পথের দুপাশে পাবেন অফুরন্ত সবুজ আর তার মাঝে মাঝে পাবেন অকল্পনীয় মূর্তি। হঠাৎ করে দেখলে আপনি বুঝতেই পারবেন না ওটা মূর্তি না কি মানুষ। এই জনপদ লোকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই মানুষরূপী মূর্তি। কোথাও আঞ্চলিক নাচের ভঙ্গীতে বা কোথাও আঞ্চলিক জীবনযাত্রায়র ছবি নিয়ে।  আরও সামনে এগিয়ে পাবেন লোক সরোবর। এখানে আপনি সরোবরের শোভা নিতে নিতে নৌকা চড়তে পারেন। অবশ্যই বিনামূল্যে নয়।

লোক সরোবরের থেকে এগিয়ে ডান হাতে পাবেন মন্দির রথ বা মন্দিরের রথ। এই মন্দির রথের সামনে রাখা আছে একটি কামান। আমি ঝুঁকে পড়ে দেখলাম, কামানের গায়ে খোদাই করা আছে এর তৈরির সময়কাল, যা হোল ২০২১। আর একটু এগিয়ে পাবেন বাচ্চাদের খেলের মাঠ। খেলার মাঠের সামনে পাবেন একটি যাদুঘর। এখানে দেখা যাবে আঞ্চলিক নাচের পোশাক পরা মূর্তি, মুখোস, বাংলার ছৌ-নাচের মুখোশ, মন্দিরের ভাঙ্গালা কাঠায়ের পিলার, পুতুলনাচের পুতুল এবং অন্যান্য জিনিসপত্র। আপনার কপাল ভাল থাকলে একটি গাইড পাবেন এখানে বিনামূল্যে। যিনি আপনাকে সমস্ত যাদুঘর ঘুরিয়ে দেখাবেন এবং বর্ণনা করবেন।

যাদুঘর থেকে বেরিয়ে একটু এগোলেই দেখেতে পাবেন গ্রামের জীবনধারা ছবি। মূর্তি, ঘরবাড়ি, কুয়ো, পঞ্চায়েত, জীবন্ত রাজহাঁস, ঢেঁকি, কুমর ইত্যাদি ছড়িয়েছি ছিটিয়ে আছে এখানে। এখানে কিছুখন কাটানোর পরে আমি এগিয়ে চললাম উপহার সামগ্রীর দোকানের। এখানে আপনি কাঠের তৈরি উপহার সামগ্রী পাবেন। ভ্রমনের স্মৃতি হিসাবে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারেন। আমি অবশ্য নিজে কিছু কিনলাম না অত্যধিক দামের জন্য। পায়েপায়ে ঘুরে ফেললাম জনপদ লোক। আরও অনেক কিছুই আছে এখানে, সব কিছু বর্ণনা করার মত ভাষা আমার নেই। বারবার নয়, মাত্র একবার ঘুরে দেখার মত একটি যায়গা এটা। বেক্তিগত মতামত যদি বলি, বেঙ্গালুরু থেকে এসে দেখার মত আহামরি কিছু নেই এখানে। যদি বাইক চালাতে ভালো লাগে, আর নতুন কিছু দেখার প্রবল নেশ থাকে তবেই আসবেন এখানে। এছাড়া ইন্টারনেট ঘাঁটলে হয়তো আমার মতো আপনারও মগজ ধোলাই হতে পারে, আর আপনি সদলবলে এসে পড়বেন জনপদ লোকে।

জনপদ লোক সমন্ধে আর একটি ব্লগ আমি লিখেছি, ওটা অবশ্য ইঞ্জিরিতে। অধমের ইঞ্জিরি অতটাও ভালো না, তবুও চেষ্টা কোরলাম। হাতে নষ্ট করার মত সময় থাকলে একটু পায়ের ধুলে দিয়ে আসবেন। লিঙ্ক দিয়ে রাখলাম। > A Journey Through Janapada Loka

আজ তাহলে এখানেই শেষ করছি, আবার কথা হবে অন্য কোনও ঘোরাঘুরি নিয়ে, অন্য কোন ব্লগে।

Facebook Comments Box